প্রাচীন পারস্যের বা আকেমেনিদ সাম্রাজ্যের (Achaemenid Empire) এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যেখানে ইতিহাসের পাতায় মিশে আছে ক্ষমতা, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাস এবং এক নারীর অসামান্য সাহসিকতার গল্প। এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুসা (Shushan) নগরী, যা তখন বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর কেন্দ্র।
সুসা নগরীর সুগন্ধ এবং ‘হাদ্দাসাহ’
গল্পের শুরুটা এক এতিম ইহুদি বালিকাকে দিয়ে। তার হিব্রু নাম ‘হাদ্দাসাহ’ (Hadassah)। হিব্রু ভাষায় এই নামের অর্থ ‘মেহেদি গাছ’ বা ‘Myrtle tree’। মরুভূমির রুক্ষতা বা বাগানের নির্জনতায় যেমন মার্টল গাছ তার চিরসবুজ পাতা আর মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে দেয়, ঠিক তেমনি হাদ্দাসাহও ছিল তার নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে এক স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের প্রতীক। সে বড় হচ্ছিল তার জ্যেঠাতো ভাই মর্দকয় (Mordecai)-এর তত্ত্বাবধানে। মর্দকয় ছিলেন একজন বিজ্ঞ ও ধার্মিক ইহুদি, যিনি রাজপ্রাসাদের তোরণদ্বারে বসতেন এবং পারস্যের ইহুদি সমাজের (Jews of Persia) সুখ-দুঃখের খোঁজ রাখতেন।
রাজা আহাসুয়েরাসের দরবার ও মহিয়সী এস্থারের উত্থান
তখন পারস্যের সিংহাসনে আসীন রাজা আহাসুয়েরাস (যাকে গ্রিক ইতিহাসে Xerxes I বা জারেক্সিস বলা হয়)। তার রাজত্ব ছিল ভারত থেকে ইথিওপিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। একবার এক বিশাল ভোজসভায় রানি ভশতীর অবাধ্যতার কারণে রাজা তাকে পদচ্যুত করেন এবং ঘোষণা দেন যে, সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী ও গুণবতী নারীকে নতুন রানি করা হবে।
ভাগ্যচক্রে, হাদ্দাসাহকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হলো। তবে মর্দকয়ের নির্দেশে সে তার ইহুদি পরিচয় গোপন রাখল। পারস্যের রাজদরবারে সে পরিচিত হলো ‘এস্থায়’ (Esther) নামে, যার অর্থ ‘তারা’ (Star)। তার সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক ছিল না, তার আচরণে এমন এক মাধুর্য ছিল যে রাজা আহাসুয়েরাস তাকেই রানির মুকুট পরালেন। ‘মার্টল গাছের’ সুবাস এখন ছড়িয়ে পড়ল পারস্যের রাজসিংহাসন পর্যন্ত।
হামানের অহংকার ও পুরিমের পটভূমি
গল্পের খলনায়ক হিসেবে আভির্ভূত হলো রাজার প্রধান উজির হামান (Haman)। হামান ছিল অত্যন্ত অহংকারী এবং নিষ্ঠুর। সে আদেশ জারি করল যে, তাকে দেখামাত্র সবাই নতজানু হয়ে কুর্নিশ করবে। কিন্তু মর্দকয়, যিনি এক এবং অদ্বিতীয় স্রষ্টায় বিশ্বাসী ছিলেন, তিনি মানুষের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করলেন।
মর্দকয়ের এই আচরণে হামানের আভিজাত্যে আঘাত লাগল। সে কেবল মর্দকয়কে নয়, বরং পুরো পারস্য সাম্রাজ্যে বসবাসরত সমস্ত ইহুদি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করল। হত্যার দিনক্ষণ ঠিক করার জন্য হামান ‘পুর’ (Pur) বা লটারি নিক্ষেপ করল। সেই লটারি অনুযায়ী আদার মাসের তেরো তারিখ নির্ধারিত হলো গণহত্যার জন্য। রাজা, হামানের ষড়যন্ত্র না বুঝেই, নিজের আংটি দিয়ে সেই মৃত্যু পরোয়ানায় সিলমোহর দিয়ে দিলেন।
সঙ্কট ও সাহস
সারা দেশে কান্নার রোল পড়ে গেল। মর্দকয় রাজপ্রাসাদের সামনে চট পরে ছাই মেখে শোক প্রকাশ করতে লাগলেন। খবর পেয়ে রানি এস্থার ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। মর্দকয় এস্থারকে খবর পাঠালেন, “তুমি ভেবো না যে রাজপ্রাসাদে আছ বলে তুমি রক্ষা পাবে। কে জানে, হয়তো এমন এক দুঃসময়ের জন্যই তুমি আজ রানির আসনে বসেছ?”
এস্থার তখন এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলেন। পারস্যের আইন অনুযায়ী, রাজার ডাক ছাড়া কেউ যদি তার সামনে উপস্থিত হয়, তবে তার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত—যদি না রাজা তার স্বর্ণদণ্ড বাড়িয়ে তাকে ক্ষমা করেন। এস্থার বললেন, “আমি আমার জাতির জন্য রাজার কাছে যাব। এতে যদি আমার মৃত্যু হয়, তবে আমি মরব।” তিনি তিন দিন রোজা রাখলেন এবং প্রার্থনা করলেন।
ভোজসভা ও হামানের পতন
তৃতীয় দিনে এস্থার সাহসিকতার সাথে রাজদরবারে প্রবেশ করলেন। তার সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে রাজা স্বর্ণদণ্ড বাড়িয়ে দিলেন। এস্থার বুদ্ধিমত্তার সাথে রাজাকে এবং হামানকে পরপর দুটি ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানালেন। দ্বিতীয় ভোজসভায়, যখন রাজা এস্থারের কাছে জানতে চাইলেন তার কী প্রার্থনা, তখন এস্থার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, “মহারাজ, আমার এবং আমার জাতির জীবন রক্ষা করুন। এক দুরাত্মা আমাদের ধ্বংস করতে চায়।” রাজা বিস্মিত হয়ে সেই শত্রুর নাম জানতে চাইলেন। এস্থার আঙ্গুল তুলে দেখালেন, “এই সেই দুষ্ট হামান!” রাজার ক্রোধের আগুনে হামানের সব পরিকল্পনা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। যে ফাঁসিকাষ্ঠ হামান মর্দকয়ের জন্য তৈরি করেছিল, শেষমেশ সেই কাষ্ঠেই হামানকে ঝুলতে হলো।
পুরিম উৎসব: আনন্দের স্মৃতি
হামান মারা গেলেও রাজার সিলমোহর দেওয়া পূর্বের আদেশ রদ করা সম্ভব ছিল না। তাই নতুন আদেশ জারি করা হলো যে, ইহুদিরা নিজেদের রক্ষার জন্য অস্ত্র ধরতে পারবে। নির্ধারিত দিনে তারা শত্রুদের পরাজিত করল এবং মৃত্যুর বদলে জীবন ফিরে পেল। এই অলৌকিক বিজয় এবং বেঁচে থাকার আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রবর্তিত হলো ‘পুরিম’ (Purim) উৎসব। ‘পুর’ বা লটারি থেকে এর নামকরণ। আজও এই দিনে ইহুদিরা এস্থারের সেই সাহসিকতা, মর্দকয়ের বিশ্বাস এবং ঈশ্বরের অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী হস্তক্ষেপের কথা স্মরণ করে। হাদ্দাসাহ বা এস্থারের গল্প কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি নয়; এটি এমন এক নারীর গল্প—যিনি ‘মার্টল গাছের’ মতোই নিজের সুবাস দিয়ে বিষাক্ত ষড়যন্ত্রের বাতাসকে শুদ্ধ করেছিলেন এবং একটি জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।
📚 তথ্যসূত্র:
1. Berlin, Adele. The JPS Bible Commentary: Esther. Jewish Publication Society, 2001.
2. Brosius, Maria. Women in Ancient Persia, 559-331 BC. Clarendon Press, 1996.
3. "Esther." Encyclopædia Britannica, Encyclopædia Britannica, Inc., 2024, www.britannica.com/topic/Book-of-Esther.
4. Levenson, Jon D. Esther: A Commentary. Westminster John Knox Press, 1997.
5. Olmstead, A. T. History of the Persian Empire. University of Chicago Press, 1948.
6. The Bible. New Revised Standard Version, Oxford University Press, 1989. The Book of Esther.
🛒 বইগুলো এখনই সংগ্রহ করুনঃ
1. https://rkmri.co/yoeyE2EMRE3p/
2. https://rkmri.co/eTM3pMpeSe3R/
3. https://rkmri.co/eAEETMMEoSme/
4. https://rkmri.co/pNNeo3elI0Il/
5. https://rkmri.co/3EMeIe0yp0eN/
6. https://rkmri.co/SSTeAMmeo5ee/
7. https://rkmri.co/AAyeeey3RpTe/
#Esther #QueenEsther #Hadassah #Purim #PersianHistory #AchaemenidEmpire #BiblicalStory #JewishHistory #WomenOfHistory #AncientPersia #Xerxes #Mordecai #FaithAndCourage #HistoryLovers #Storytelling #এস্থার #রানিএস্থার #পুরিম #পারস্য #ইহুদিইতিহাস #আকেমেনিদ #ইতিহাস #গল্প #মহিয়সীনারী #সাহস #বাইবেলেরগল্প #ঐতিহাসিক #সাহিত্য #বিশ্বইতিহাস
©কাল-প্রহেলিকা
Writer: Unknown
No comments:
Post a Comment